কিপটে না হিসেবী || অমিত বন্দ্যোপাধ্যায় || সাহিত্যগ্রাফি - Songoti

কিপটে না হিসেবী || অমিত বন্দ্যোপাধ্যায় || সাহিত্যগ্রাফি

Share This

তোমার তো কিছুই মনে থাকে না , আগামী সোমবার শুভর জন্মদিন , এবার কিন্তু ওকে একটা ভালো মোবাইল দিতে হবে । 

কেন ? ওর মোবাইল টা তো ঠিকই আছে , ফোন - টোন সবই তো করা যাচ্ছে । 
ওর বন্ধুদের সব দামী দামী অ্যান্ড্রয়েড ফোন আর ওর সেই আদ্যিকালের নোকিয়া , লজ্জায় ও বন্ধুদের সামনে ফোন বের করতেই পারে না । 

আমাদের মতো ঘরে ওটাই ঠিক আছে । পরের বছর চাকরি পেয়ে নিজের রোজগারে যা খুশী কিনুক । 

তোমার মতো কিপটে লোক আমি দুটো দেখিনি । তোমার অফিসের সাহাদার ছেলের হাতেও তো কতবড় ফোন !  সাহাদা তো তোমার থেকেও নিচু পোষ্টে চাকরি করে । ও দেয় কি করে ? 

ওদের কথা ছাড়ো , ওর বাবার অনেক সম্পত্তি তাও বাজারে কত ধার জানো ? 

                              তোমার ও তো জমি কিনতে হয়নি , শ্বশুর মশাইয়ের কেনা জমিতে কোনরকম দুটো ঘর করেছ আর সাহাদার বাড়ি দেখেছো ? সিড়ি থেকে বাথরুম সব মার্বেল ।গত  পরশু সাহাদার বউ চুমকি বলছিল এই পুরোনো কিচেন ভেঙে মডিউলার কিচেন করবে । অর্ডার দেওয়াও হয়ে গেছে আর তোমাকে কবে থেকে বলছি একটা কিচেন চিমনি কেনো তাতেই বলছো পয়সা নেই । 

আমাদের একজষ্ট ফ্যান তো ভালোই চলছে খামোকা পয়সা নষ্ট করতে যাবোই বা কেন ? 

     তোমার তো সবেতেই পয়সা নষ্ট ! জীবনের তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে , সারাজীবন তো হেঁসেল ঠেলেই গেলাম । দীঘা , পুরীর বাইরে কোথাও নিয়ে গেছো ? এখন তবু তোমার চাকরি আছে দুবছর পর রিটায়ার্ড করলে তো মনেহয় ডাল ভাত ও জুটবে না ! 

এবছরই তো তোমার শুভর ইঞ্জিনিয়ারিং এর ফাইনাল ইয়ার , শুভ চাকরি পেলে তোমাকে আর দেখে কে ? 

সে তো নিশ্চয়ই , শুভ তোমার মতো কিপটে নয় । ওকে ও তো গুনে গুনে হাতখরচা দাও নেহাত ভালো ছেলে বলে কিছু বলে না । সাহা দার ছেলের মতো প্রাইভেট কলেজে পড়াতে হলে বুঝতে কত ধানে কত চাল ! 

শুভ তোমার মতো অবুঝ নয় ,  ও ওর বাবার কষ্ট বোঝে । 

আমি অবুঝ ? তাতো বলবেই ,  সেই কুড়ি বছর বয়েসে বিয়ের পর থেকেই তোমাদের বাড়ির হাঁড়ি ঠেলছি । পুজোয় একটা শাড়ির বেশী দুটো দাওনি । পঁচিশ বছরের বিবাহিত জীবনে কি পেয়েছি ?  বিয়ের গয়না বাদে তো একটা সোনার চেন আর পলা বাঁধানো । আর কিছু দিয়েছো ? তার পরেও আমি অবুঝ -  বলেই ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল শ্রীতমা । 

        সরি , আমি ঠিক ওভাবে বলতে চাই নি । আমাকে তো সবদিক সামলে চলতে হয় । ঠিক আছে সামনের মাসে সংসার খরচের সাথে পাঁচ হাজার এক্সট্রা দিয়ে দেব শুভকে একটা নতুন মোবাইল কিনে দিও । 

পাঁচ হাজারে হবে না । দশ হাজার টাকা বেশী দিতে হবে । 

আপাতত তোমার থেকে দিয়ে কিনে দিও পরে তোমায় শোধ করে দেব । 

আমি কোথায় পাব ? আমি কি চাকরি করি ? 

বাড়ির বউ দের আবার চাকরি করতে হয় নাকি ? স্বামীদের পকেট কেটেই তো দিব্যি চলে যায় । 

তোমার মতো কিপটে স্বামীর পকেট কাটবো ?  পাই পয়সাও তো গুনে রাখো । 

   তাহলে মাঝে মাঝেই নতুন শাড়ি আসে কোথা থেকে শুনি ? 

ওগুলো তো ইনস্টলমেন্টে কিনি । 

ও তাতে বুঝি টাকা দিতে হয় না ? 

ওতো সংসার খরচ বাঁচিয়ে মাসে মাসে কিছু দিই । 

 তার মানে তুমিও কিপটেমি করো ! 

মোটেই না , আমি কিপটে নই তোমার পাল্লায় পড়ে কিপটে হতে বাধ্য হয়েছি । কথায় বলে না - সঙ্গ দোষে স্বভাব নষ্ট !  গতমাসে সেজপিসির মেয়ের বিয়েতে তোমায় কত করে বললাম অন্ততঃ সোনার কানের দুল দাও দিলে তুমি ?  আমাদের সব বোনেরা সোনা দিল আর আমি একটা তাঁতের শাড়ি ।  কি লজ্জা !  কি লজ্জা ! ! 

কি করব বলো , তোমার দিদিরা সব বড়লোক আর আমি - 

 তুমি কিপটে ,  আমার মেজদি , ছোড়দির বর প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে , তোমার থেকেও কম মাইনে পায় । আসলে লোককে দেবার মন থাকা চাই বুঝলে । 

আমি কিপটে নই আমি হিসেবী আমি অপাত্রে দান করি না । 

ওসব জানি না , সামনের মাসে দশ হাজার টাকা বেশী দেবে নাহলে তোমার সংসার তুমি চালাবে আমি পারব না । 

ঠিক আছে , সামনের মাসে দেখা যাবে । এখন কিছু খেতে দাও তো । শরীরটা ভালো লাগছে না । খুব ক্লান্ত লাগছে তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ব । 

কি হলো গো ?  মাথা ধরেছে ? বাম লাগিয়ে দেব ? 

না গো । বুকটা চাপ চাপ লাগছে । মনে হয় গ্যাস হয়েছে অফিসে দুটো সিঙারা খেয়েছিলাম । 

কতবার বলেছি একটা ডাক্তার দেখাও , বয়স হচ্ছে এখন তা কে শুনবে আমার কথা ! সেখানেও তো পয়সা খরচ হয়ে যাবে । 

আচ্ছা বাবা , কাল না কমলে ডাক্তার দেখাবো , এখন বকবক না করে কিছু খেতে দাও খুব ঘুম পাচ্ছে । 

তুমি অ্যান্টাসিড টা খেয়ে নাও আমি খাবার গরম করছি । 

                     **************


ভোররাতে হঠাৎ গোঙানির শব্দে শ্রীতমার ঘুম ভেঙে গেল । বেড সুইচ টা জ্বালতেই দেখলো সৌমাভর মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে । মায়ের চিৎকারে পাশের ঘর থেকে শুভ ও দৌড়ে এলো । বাবার এই অবস্থা দেখে সঙ্গে সঙ্গেই  সে ট্যাক্সি আনতে ছুটলো । মিটারের থেকেও একশ টাকা বেশী দেবে বলে রাজি করিয়ে বাবাকে নিয়ে চলল হাসপাতালের পথে । 

ট্যাক্সিতে যেতে যেতে জড়ানো গলায় সৌমাভ বলল - শ্রী আমি বোধহয় আর বাঁচব না........ আমি অঙ্গীকার পত্রে সইকরে রেখেছি ।........... আমার মৃত্যুর পরে আমার দেহ মেডিকেল কলেজে দান করে দিও ।............ তোমার আর শুভর কোন অসুবিধা হবে না আমি সব নমিনি করে রেখেছি ।........... প্রতিমাসে বারুইপুরে " আশ্রয় অনাথ আশ্রমে " আমি দশ হাজার টাকা করে দিই । ওটা বন্ধ কোরো না ।.......... ওটা না পেলে বাচ্চাগুলোর খুব অসুবিধা হবে ।........... আমার যা MIS করা আছে তা থেকেই ওটা হয়ে যাবে ।............ আমার ফোনে ওদের নম্বর সেভ করা আছে ।........... ওদের একটা খবর দিও । 

শ্রীতমা কাঁদতে কাঁদতে বলল - তুমি একটু চুপ করো , তোমাকে আমি কোথাও যেতে দেব না । 

হাসপাতালের ডাক্তার দেখেই সৌমাভ কে ICCU তে ভর্তি করে নিলেন এবং বললেন ম্যাসিভ স্ট্রোক,  বাহাত্তর ঘন্টার আগে কিছু বলা যাবে না ,  We shall try  কিন্তু পরদিন সকালে সৌমাভ সব মায়া কাটিয়ে চলে গেল । 

বিকেলে যখন তাঁর মরদেহ " আশ্রয় " ঘুরে মেডিকেল কলেজের পথে পা দিল আশ্রয়ের বাচ্চাগুলো কিছুতেই  তাদের " সোম জেঠু কে " যেতে দেবে না । কে তাদের প্রতিবছর শীতে চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাবে ? কে সবার জন্মদিনে মনে করে কেক নিয়ে আসবে ? কে পুজোয় নতুন জামা দেবে ? 

তোমাদের কোন অসুবিধা হবে না । জেঠু যা যা করতো সব এই দাদা ও জেঠিমা করবে । জেঠু তোমাদের সব ব্যবস্থা করে রেখে গেছে । তোমরাও তোমাদের জেঠু কে চিনতে পারলে শুধু আমি পারলাম না বলেই  কান্নায় ভেঙে পড়ল শ্রীতমা ॥ 

No comments:

Post a Comment