বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের কফিন নিয়ে বিভ্রান্তি - Songoti

বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের কফিন নিয়ে বিভ্রান্তি

Share This


 শ্রীজিৎ চট্টরাজ : রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ১৯৭৫ সালের ২৬ জুন দেশে জরুরি অবস্থা জারি করার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশেও সেখানকার রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৭৫সালে মুজিবের১৫ আগস্ট ঢাকার বাসভবনে একদল বিদ্রোহী সেনা চড়াও হয়।পূর্বপরিকল্পিত ভাবেই ভোররাতে ঘুমন্ত রাষ্ট্রপতি মুজিবর রহমানসহ তাঁর পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে খুন করা হয় নৃশংস ভাবে।


রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি,ভারতের সঙ্গে সোভিয়েত মৈত্রীর প্রভাব বাংলাদেশে পড়ছিল।তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক পথে একসাথে চলছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব।যা একদম নাপসন্দ ছিল আমেরিকা ও চীনের। ফলে ধর্মীয় রক্ষণশীল কিছু এবং ভারতবিরোধী   বাংলাদেশের সেনাপ্রধানরা আমেরিকার গোয়েন্দাবিভাগের প্রশ্রয় পেয়ে মুজিব হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করে।খুন করা হয় মুজিবসহ পরিবারের সবাইকে। সেই সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ। আফশোষ করেন জাতির জনকের প্রাণরক্ষায় ব্যর্থতার জন্য। এক সেনা আধিকারিক জিয়াউর রহমান যিনি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সিংহাসন দখল করেন,তিনি বলেছিলেন, শেখ মুজিব নিহত হয়েছেন তো কি হয়েছে?সংবিধান মতে উপ রাষ্ট্রপতি আছেন,তিনি দায়িত্বভার নেবেন। এই জিয়াউর রহমান ছিলেন পাকিস্থান আমলের সেনা আধিকারিক।তাঁকে স্বাধীনতাপ্রেমী আর এক সেনা আধিকারিক ক্যাপ্টেন খালিকুজ্জামান অনুরোধ করেছিলেন, আক্রমণকারী পাক সেনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে। কিন্তু জিয়াউর উল্টে পাকিস্থানি সেনাদের সাহায্য করেন। সময়টা ছিল ১৯৭১সালের ২৫মার্চের রাত। পরবর্তী সময়ে দেশে জন প্রতিরোধ গড়ে ওঠায় বাধ্য হন তিনি পাকসেনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে।সেই মুহূর্তে এই বিশ্বাসঘাতক সেনা আধিকারিকের বিরুদ্ধে পাক বিরোধী বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী সেনা আধিকারিকদের উচিত ছিল সাবধান থাকার। কিন্তু সেই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত না নিতে পারার মাশুল স্বাধীনতার পর দিতে হয় বাংলাদেশের মানুষদের।

ফিরে যাবো ১৯৭৫সালের ১৫আগস্ট ভোরবেলায়।পাক মদতপুষ্ট বাংলাদেশী সেনাদের একাংশের হত্যালীলা সংঘটিত হলো । পরিবারসহ নিহত হলেন শেখ মুজিব। মৃতদেহগুলি তড়িঘড়ি কফিনবন্দি করা হয়।তালিকায় শেখ মুজিবের ভাই শেখ নাজিরও ছিলেন। শেখ মুজিবের সঙ্গে তাঁর চেহারায় ছিল সাদৃশ্য। ফলে বিদ্রোহী সেনারা বুঝে উঠতে পারেন না কোনটি রাষ্ট্রপতির দেহ। তাঁদের হাতে সময় ছিল কম।কারণ তাঁরা জানত, বেলা বাড়তেই রাষ্ট্রপতির অনুগত সেনার কাছে এই অভ্যুত্থানের  খবর ছড়িয়ে পড়লে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে।সেক্ষেত্রে কমসংখ্যক বিদ্রোহী সেনাদের জন্য বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বাসঘাতক বিদ্রোহী সেনারা সবকটি কফিন নিয়ে ঢাকায় বনানী গোরস্থানে  গিয়ে দ্রুত সমাহিত করে। পরে আলাদা করে চিহ্নিত করা হয় খুন হয়ে যাওয়া বঙ্গবন্ধু মুজিবকে।দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অধিনায়ক মুজিবর রহমানের এই নিষ্ঠুর পরিণতি কিন্তু অভিপ্রেত ছিলো না।


এই মুহূর্তে বিষয়টির অবতারণার কারণ, আসন্ন ১৬ ডিসেম্বর তারিখটি স্মরণে রেখে।দিনটি বাংলাদেশের বিজয় দিবস।চলতি বছরে যা বাংলাদেশ ও ভারতে পালিত হবে ৪৭তম বিজয়দিবস হিসেবে।বাংলাদেশ  পরিচিত ছিল পূর্ব পাকিস্তান  হিসেবে। মাতৃভাষা বাংলার অবমাননার বিরুদ্ধে ধর্ম পরিচয় উহ্যে রেখে সেখানকার কোটি কোটি বাঙালি প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলেন। নেতৃত্বে ছিলেন শেখ মুজিব।শঙ্কিত পাক সরকার ১৯৭১সালের ২৫মার্চ রাত্রে সেখানকার একদল বিশ্বাসঘাতক বাঙালি তথা রাজাকারদের মদতে হত্যালীলা চালায়।দীর্ঘ  ন' মাস ব্যাপী প্রতিরোধ আন্দোলনে নিহত হোন ৩০লাখ বাঙালি। পাক সেনা আর রাজাকারদের হতে গণধর্ষিত হন ২লাখ বঙ্গললনা ।

প্রতিবেশী দেশ ভারত চুপ করে থাকেনি । সেনা প্রেরণসহ সব ধরণের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই যুদ্ধে ভারতের প্রায় ৩ হাজার ৯০০সেনা শহীদ হন।শেষ পর্যন্ত ১৩দিনের লড়াইয়ে ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ করে পাক সেনা। সেদিনটি ছিল ১৯৭১সালের ১৬ ডিসেম্বর।কলকাতা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে হেলিকপ্টারে  উড়ে গেলেন ভারতীয় সেনার  কমান্ডার জগজিৎ সিং  অরোরা, মেজর জেনারেল এফ আর জেকব। বেলা ৪ টে ৩১ মিনিট।ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে অধুনা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাক কমান্ডার লেফট্যানেন্ট জেনারেল এ কে নিয়াজি তাঁর ৯৩ হাজার সেনাসহ আত্মসমর্পণ করেন। এই আত্মসমর্পণ যে কোনও দেশের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। ভারত ও বাংলাদেশের জন্য যা রীতিমত গর্বের।

পদ্মা গঙ্গা দিয়ে এরপর বয়ে গেছে অনেক জল।সেই হত্যাকাণ্ডের সময় জার্মানিতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান মুজিবের দুই কন্যা। এঁদেরই একজন শেখ হাসিনা।আজ তিনি বাংলাদেশের প্রধান।ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ক্রমশ পরিণত হয়েছে।কিন্তু কিছু কিছু বিষয়ে বাংলাদেশ মনে করে, তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের কাছে।বঞ্চনার ক্ষেত্রে তালিকায় প্রধান বিষয় ফারাক্কার জল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য, কংগ্রেস আমলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের একটি অবাঞ্ছিত মন্তব্যে  দুটি দেশের মৈত্রীতে যে ছন্দপতন ঘটেছিল তার তেমন কোনও পরিবর্তন ঘটেনি।কিছুদিন আগে ভারত সফরে আসেন বাংলাদেশের প্রধান শেখ হাসিনা।কিন্তু সে সফরে ভারত লাভবান হলেও বাংলাদেশের স্বার্থ সফল হয়নি । এমনই বলেন বাংলাদেশের প্রশাসনিক মহল ।ভারতও দিনটি পালন করে বিজয় দিবস হিসেবে।প্রধানমন্ত্রীসহ কেন্দ্রের মন্ত্রীরা পাক সেনার বিরুদ্ধে ভারতের জয়ের কথা টুইটারে লেখেন। সেখানে উচ্চারিত হয়নি বাংলাদেশের নাম।অথচ এই বিজয় যেমন সম্ভব হয়েছিল ভারতীয় সেনার রক্তের বিনিময়ে, তেমনই বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ দেশপ্রেমীর কান্না ঘাম রক্তে।দুই বাংলার বাঙালির কাছেই দিনটি গর্বের।অহংকারের।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here

Pages