‘বড়লোকের বিটিলো লম্বা লম্বা চুল’ – এবং আমাদের ক্ষয়িষ্ণু মানস | তাসলিমা মুন শেখ (সুইডেন) - Songoti

‘বড়লোকের বিটিলো লম্বা লম্বা চুল’ – এবং আমাদের ক্ষয়িষ্ণু মানস | তাসলিমা মুন শেখ (সুইডেন)

Share This
তাসলিমা মুন শেখ, সুইডেনঃ সম্প্রতি এ গানটি ফেইসবুক পৃথিবীর সামনে এসেছে। বিষয়টির ইতিহাস আমার পুরোপুরি জানা নয়। খুব সম্ভব মুম্বাই গ্লিটজ পৃথিবীর কোন শরীর ঝাকানো নাচে ব্যবহার করা হয়েছে। মধ্যবিত্ত সাংস্কৃতিক মননশীলতা এক্টু কেঁপেছে মনে হলো।
প্রসঙ্গ এখানে অনেকগুলো। গানটি বিষয়ে নতুন প্রজন্ম কিছু জানে বলে মনে হয়না। তারা এ গানের লিরিক বিষয়েও কিছু জানে তাও মনে হয়নি। গানটি কেন ভুঁই ফুঁড়ে এসে ফেসবুকে জায়গা করে নিলো, সেটি দেখে আমার এক প্রকার আমোদই হয়েছে।
Boro Loker Beti Lo (বড় লোকের বেটি লো) Lyrics in ...
সিনিয়র সিটিজেন হওয়ায় সুবিধে এটা যে, কিছু ইতিহাসের অংশ হিসেবেও নিজেদের জাহির করা যায়।
আমাদের ছোটবেলায় পাড়ার বিয়ে বাড়িতে মাইকে গান বাজানো হতো। সেখান থেকে 'বড়লকের বিটিলো লম্বা লম্বা চুল' – গানটি আমারা কে না শুনেছি?
কিন্তু সে গানটি এ জেনারেশনকে একটি ঝাঁকি দিয়েছে। শ্লীলতা বা অশ্লীলতার প্রশ্নও দেখা দিয়েছে।
সবচাইতে দৈন দশা এই যে আমাদের মাটি ও মননের সাহিত্য নিয়ে এগুচ্ছিনা। এগুতে পারছিনা। সংরক্ষণ করছিনা আমাদের এক বিশাল অবহেলিত সম্পদ। বহুবিধ থাবায় আমাদের শেকড় ও সংস্কৃতি নিঃশেষ হতে চলেছে। ধর্মের রাহুগ্রাসে আমাদের বাউল শ্যামল বাংলা রূপান্তরিত হয়েছে কারবালার মাঠে। আজ গানই ঝুঁকিতে। সেখানে শেকড়কে রক্ষা করাই হয়ে গেছে এক বড় চ্যালেঞ্জ। সেখান থেকে এক টুকরো ফোক নিয়ে কেউ যদি ব্যবসা করতে চায় আমাদের পরিশীলিত মন কাতর হতেই পারে। আমি বুঝতে পারি এ দুমুখী টানাপোড়ন।
'বড়লকের বিটিগো লম্বা লম্বা চুল' – গানটি এমন একটি গান যা মরমে প্রবেশ করে যায়। দৈনন্দিন জীবন-শৈলী ও নন্দন শিল্পে ঢুকে যায়। মননের গভীর থেকে বেজে ওঠে। মনে হয়, মাটির সোঁদা সারল্য এখনও জীবন থেকে বিদায় নেয়নি। মনের ঐশ্বর্যরাজির এগুলো একটি স্তম্ভ এগুলো! এ গানের ইতিহাস, রচয়িতা, অর্থ নিয়ে আর ভাবা হয়না। মনের ভেতরটা আপন করে নেয় এ সুর।
এমন গান আরও আছে। বড়লোকের বিটিগো রচনা করেছিলেন রতন কাহার। এমন ঐতিহাসিক গীত-সাহিত্য রচনাকারী নিভৃতেই হতদরিদ্র জীবন যাপন করেন।
গানটির রচনা এক কুমারী মায়ের অবহেলিত সন্তানের চুল বেঁধে দেওয়ার সময়ের গুনগুনানি। মা আপন মনে স্বপ্নে বিভোর হন, তার মেয়ে যেন ঐ বড়লোকদের 'বিটি' যার লম্বা লম্বা চুল। আর সে মেয়ের চুল আদরে ভালবাসায় লাল গেন্দা ফুলে সাজিয়ে দিচ্ছে। এক কুমারী অচ্ছুৎ মায়ের এমন স্বপ্ন কাজল চোখের গল্প গানে তুলেছিলেন রতন কাহার।
পৃথিবীর সকল অপারগ মায়ের মানস এ গানে কাহাঁর তুলে ধরেছেন কি মাহান বিশালত্বে। মানব মনের কতটা বিশালতায় পৌঁছলে এমন মহান কাব্য রচনা করা যায়?
আমি শুধু ভাবি, এমন শিল্পীরা কেন অস্কার পায়না? এ মানুষটির মত বড় মহৎ শিল্পী পৃথিবী কি রোজ পান?
এ গল্পগুলো লেখার মানুষ আছে এবং ছিল বলেই এ বেদনাময় জীবনের ভার কিছুটা লাঘব হয়। নতুবা কত অজানা বেদনা, গ্লানি, অপমান নিয়ত লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়।
আমাদের সমাজে এ গানের মূল গল্পটি যদি একজন কুমারী মাও না হতো, তবু এ গল্প প্রতিটি হতদরিদ্র গৃহের!
শ্রেণী বৈষম্যের এ পাথর সমাজের এক অতি প্রাচীন চিত্র। সে চিত্র নিয়ে গান ফেঁদেছেন মুম্বাইয়ের উচ্চবিত্ত গ্লিটিজ ক্লাস। মানুষ খাবে। ব্যবসা হবে। শিল্প সাহিত্য, বিদগ্ধ দর্শক নয়, বিক্রয় হবে হড়হড় করে। এ বিষয়ে তাঁরা নিঃসন্দেহ হয়েই এটি ব্যবহার করেছেন।
আমরা একদিকে মাটির গানগুলো সংগ্রহ করার এক সীমাহীন শূন্যতায় রয়েছি। অন্যদিকে রিমিক্সের পরীক্ষায় এ গানগুলোকে আমরা সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারছিনা। এ দৈন্যতায় কবলিত আজ আমার মাটি এবং শেকড়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here

Pages