গান গিয়েছে চুরি, দলিত দমন যুগে যুগে - Songoti

গান গিয়েছে চুরি, দলিত দমন যুগে যুগে

Share This
শ্রীজিৎ চট্টরাজ, কলকাতা: নাম তাঁর রতন কাহার।বীরভূমের ভূমিপুত্র।স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে অনেক আগেই। তিন ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে সংসার দারিদ্রতা নিত্যসঙ্গী।নিজের লেখাপড়ার সুযোগ হয়নি।দারিদ্রতা ছেলেমেয়েদে রও একই অবস্থা।বাংলায় এমন রতন কাহারের সংখ্যা কম নয় । আসলে হাজার রতনের ভিড়ে আমাদের এই রতনও হারিয়ে যেতেন।কেননা বঞ্চিত বান...... মত অনেক বঞ্চনা এতদিন মুখ বুঝে সহ্য ভিড়ে এসেছেন।স্রেফ দারিদ্রতার কারণেই। লোকগীতি  তাঁর রক্তে।আজও ভোর হতেই পৌষ সংক্রান্তি থেকে চৈত্র  সংক্রান্তি পর্যন্ত সিউড়ি শহরের পথে পথে লোকগীতি গেয়ে বেরান।নিজেই বাঁধেন সুর।করেন গানের শব্দ চয়ন।যেভাবে ১৯৭২ সালে লিখেছিলেন গান বড় লোকের বিটি লো,,,,,,।বাড়িতে যাতায়াত ছিল  সিউড়িনিবাসী সুরকার মানস চক্রবর্তী ও  তাঁর স্ত্রী  লোকগীতি শিল্পী স্বপ্না চক্রবর্তী।এই গানটি নিজের খাতায় তুলে নেন স্বপ্না।লোকগীতির প্রচার ও প্রসারে উদ্যোগী রতন কাহার তাই আপত্তি করেননি।১৯৭৬ সালে   অশোকা রেকর্ড কোম্পানিতে স্বপ্নার রেকর্ড করার সুযোগ আসে ।ওদিকে সিউড়ির জনৈক গণনাট্যের শিল্পী রতন কাহারকে খবর দেন তাঁর গান রেকর্ড হয়েছে।কিন্তু রেকর্ডে গানের সুরকার ও গীতিকার হিসেবে তাঁর নাম নেই।

Badshah on Genda Phool controversy: Ratan Kahar's name not in ...

রতন বাবুর বুঝতে অসুবিধে হয় না স্বপ্না চক্রবর্তী তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।কলকাতায় তিনি যোগাযোগ করেন অশোকা রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে।সেখানে অপেক্ষা করছিল তাঁর জন্য আরেক অসম্মান। ঘাড় ধরে তাঁকে বের করে দেওয়া হয়।মাথা নিচু করে রতন কাহার বীরভূমে ফিরে আসেন।এছাড়া উপায় কি ?মামলা করতে তো পয়সা দরকার,দুবেলা দুমুঠো খাবার জোটে না যার,সে মামলা করবে ? সেতো বিলাসিতা। নিজের অদৃষ্টকেই দায়ী করে সবার অলক্ষ্যে কাটিয়ে দিলেন এতগুলি বছর।করোনা ভাইরাসের প্রকোপে এ এমন কি ঘটনা যে প্রকাশ্যে আসবে?তবু প্রকাশ্যে এলো।কারণ মুম্বাইতে ব্যাপ শিল্পী বাদশা জ্যাকলিনকে নিয়ে মিউজিক ভিডিও বানিয়ে সুপার ডুপার হিট হয়েছেন।সেখানে ব্যবহার করেছেন রতন কাহারের বড় লোকের বিটি লো গানটি।সব শুনে বেশ হতাশ গ্রাম্য লোকশিল্পী রতন কাহার । তাঁর বক্তব্য,আমায় টাকা পয়সা না দিল নামের স্বীকৃতিটুকু কি আশা করতে পারি না?
সংবাদ সুত্র বলছে,বাংলা পক্ষ নামে এক সংস্থা জানিয়েছে, তাঁরা শিল্পী রতন কাহারের স্বীকৃতির জন্য আইনি লড়াই লড়বেন।খবরটা কানে গেছে মুম্বাই শিল্পীর।তাঁর বক্তব্য,ব্যাপারটি আমার জানা ছিলো না।আমি আমার অনুরাগীদের কাছে অনুরোধ,বাংলার এই শিল্পীর সঙ্গে যোগাযোগ করে দেওয়ার জন্য। ঠেলার নাম বাবাজি। বাদশা না  হয় শিল্পীর যোগ্য মর্যাদা দেবেন।কিন্তু এই বাংলার শিল্পী স্বপ্না ?তিনি কি এত বছর পর হলেও পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবেন?
স্বপ্না নিজে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন ,অশোকা রেকর্ড কোম্পানির ব্যানারে তাঁর দুটি গান ১৯৭৬সালে মুক্তি পায়। কিন্তু কোম্পানি তাকে কোনও রেকর্ড সৌজন্য বশত  দেয়নি।তাকে কিনতে হয়। অথচ সেই রেকর্ড গোল্ডেন ডিস্ক হয়েছিল।
ঠিকই বলেছে ন স্বপ্না।সেই রেকর্ডে ছিল দুটি গান।একটি বলি ও নন দি  ।অন্যটি  বড় লোকের বিটি লো।প্রথমে দুটি গানের গীতিকার সুর কারের নাম রেকর্ডে ছিল না ।প্রথম গানটির দাবিদার ছিলেন আশা নন্দন চট্টরাজ।অন্যটি রতন কাহার। আশা নন্দন আদালতে অভিযোগ জানিয়ে মামলা জিতে নিজের স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছেন।পরে এইচ এম ভি কোম্পানি স্বীকৃতি দেন।কিন্তু রতন কাহার হারিয়ে গেলেন অন্ধকারে। অথচ এমন তো হওয়ার কথা ছিল না।
কাহার পদবীর সুত্র খুঁজলে দেখবেন প্রাচীনকালে এই আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবিকা ছিল পালকি বাহকের।পালকি চলে দুলকি চালে।তাল মিলিয়ে গান বাঁধতেন কাহার রা।সেদিন জমিদার বা ধনী গৃহের পালকি বাহকের কাজ ছাড়াও বিয়ের পর কনে কে শ্বশুর বাড়িতে পালকি বাহকেরাই পৌঁছে দিতেন। এছাড়া মাছ ধরা ,কৃষিকাজ ছিল কাহারদের কাজ।রতন কাহারে র শৈশব কেটেছে মামার বাড়িতে। কেন্দুলিতে।মামার ছিল গানের দল।সেখানেই আলকাপ, লোটো
গান শেখা। কৈশোরে যাত্রায় ফিমেলের পার্ট।ভাদু গানেও ছিলেন চোস্ত । সিউড়ির এক পতিতালয়ে আলাপ হয় মাসী হরিদাসী র সঙ্গে ।সেখানে শেখা খ্যামটা, ঝুমুর।সেখানে আলাপ এক ডবকা  ছুঁড়ির সঙ্গে ।সে  শুনিয়েছিল তার নাগরের কথা ।বিশ্বাস করেছিল তাকে।কিন্তু তার সন্তান যখন পেটে ধরল,পালিয়ে গেল সেই নাগর।জন্মালো কন্যা সন্তান। মেয়েটির ঠাঁই হলো পতিতালয়ে ।মেয়ে যখন বড় হলো সাজা গোঁজার শখ হলো তার বড় লোকের বিটির মত।সেই ঘটনার প্রেক্ষিতে রতন কাহার গান বাঁধেন বড় লোকের বিটি লো,লম্বা লম্বা চুল,এমন মাথায় বেন্দে দিবো লাল গেন্দর ফুল।

Baro Loker Betilo (2017) - Swapna Chakrabarty - Listen to Baro ...

রতন কাহারের বক্তব্য ,গান গাওয়া ছিলো নেশা ,আজও গাই । কোনোদিন পেশা হিসেবে গুরুত্ব দিইনি । বিড়ি বাঁধাই ছিল পেশা। ক টাকাই বা পেতাম। একটা হারমোনিয়াম পর্যন্ত কিনতে পারিনি। রতন কাহারের আলাপ হয় অভিনেতা পাহাড়ি সান্যালের সঙ্গে । তাঁর দৌলতেই আকাশবাণীর আর্য্য চৌধুরীর সঙ্গে আলাপ । চুটিয়ে গান গেয়েছেন রেডিওতে। পরে বয়স হয়ে যাওয়ায় গানের ডাক আসা বন্ধ হয়ে যায়। এখন রতন কাহারের সঙ্গী দারিদ্রতা আর বঞ্চনা। সরকারি সামান্য সাহায্য আর তিন ছেলের সামান্য আয় সম্বল। ধনীর দুনিয়ায় দরিদ্রের বঞ্চনা নতুন নয়। তার ওপর যদি হন কেউ আদিবাসী ভূমিপুত্র, তো কথাই নেই। উচ্চবর্ণের বাঙালি বরাবর ঘৃণা করে এসেছে আদিবাসী ভূমিপুত্র দের তাদের বাসস্থান  কেড়ে ছে, তাদের সংস্কৃতি আত্মসাৎ করেছে। ইতিহাসে পুরাণে আছে শত শত প্রমাণ। এই তো সেদিন কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের প্রধান ড:সরস্বতী কেরকেটটা কে তাঁর জাত ও গায়ের রং নিয়ে বিদ্রুপ করা হয়।চুনি  কো টালের অপমানিত হয়ে আত্মহত্যার কথা আমরা কে না জানি ? সম্প্রতি একটি প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত  হয়েছে বাংলা অভিধান।সেখানে অধ্যাপক দেবাশীষ দত্ত লিখেছেন, সাঁওতাল অর্থাৎ এক আদিম অসভ্য জাতি বিশেষ । অথচ সরকারি অনুষ্ঠানে,রাজনৈতিক মিছিলে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এই অসভ্য জাতিকে উপস্থিত করে বোঝানো হয় আমি তোমাদেরই লোক। আসলে রাজনৈতিক,সামাজিক ,অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে উচ্চবর্ণের আগ্রাসী আধিপত্যের আগ্রাসন নতুন নয়। ভূমিপুত্রদের সংস্কৃতি চুরির ঘটনাও  নতুন নয়।অন্যের সৃষ্টিকে চুরি করাকে ইংরেজিতে বলে প্ল্যেজারিজম। বাংলায় বলে কুম্ভিলক । সভ্য দেশে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি 
ভায়োলেশন অ্যাক্টে অপরাধ।
সম্প্রতি বাংলাদেশের গায়ক নোবেলের বিরুদ্ধেও এই অভিযোগ উঠেছে।২০০২ সালে ম্যানবুকার পুরস্কার পান কানাডার লেখক ইয়ান মার্টল তাঁর লাইভ অফ পাই বইটির জন্য। অথচ তিনি গল্পটি চুরি করেন ব্রাজিলের লেখক মোয়াসি শ্লেয়ারের ম্যাক্স অ্যান্ড দ্য ক্যাটস থেকে।পাবলো নেরুদার চুরি ধরিয়ে দেন চিলির কমিউনিস্ট লেখক ভলদিয়া টেটি বয়েম জ্যাকুইন সেপভেদা। শেক্সপিয়ারের ইতিহাসনির্ভর এগারোটি নাটক সম্বন্ধে অভিযোগ তিনি গল্পগুলি চুরি করেন রাফায়েল হলিনস হেজের  ক্রণিকেলের লেখা থেকে।
আমাদের দেশে ধর্মীয় আখ্যানেও আছে আদিবাসীদের ঘৃণা ও বঞ্চনার কথা । ভীম পুত্র ঘটোৎকচের মৃত্যুতে কৃষ্ণের আনন্দ ,রামের শম্বুক হত্যা , নিষাদ রাজের কাছে পালিত খুড়তুতো ভাই একলব্যকে হত্যা করেন শ্রী কৃষ্ণ। গীতায় ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় ছাড়া বাকি সববর্ণের ও জাতির মানুষকে শ্রীকৃষ্ণ পাপ যোনি বলেছেন। সুতরাং এযুগে ভূমিপুত্র আদিবাসী রতন কাহারেরর গান চুরি করে তাকে বঞ্চিত করে এমন কি ব্যাপার ? দেখা যাক ,বাংলাপক্ষের  উদ্যোগে রতন কাহারের স্বীকৃতি আদায়ের ধর্মযুদ্ধের ফল কি হয়। রতন কাহার পাবেন কি তাঁর যোগ্য স্বীকৃতি? ইতিহাসে কি স্থান পাবে ? বাংলা তথা বিশ্বের বাঙালিরা কি জানবে বড় লোকের বিটি লো গানের গীতিকার ও সুর প্রচলিত নয় গানের সৃষ্টিকর্তা সিউড়ি নিবাসী  রতন কাহার। যিনি আজও গান বাঁধেন। অর্থ নয়,চান শুধু স্বীকৃতি।একটু সম্মান।

1 টি মন্তব্য:

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here

Pages