অন্য আকাশ || সজল আরাফ || সাহিত্যগ্রাফি - বিশেষ সংখ্যা - Songoti

অন্য আকাশ || সজল আরাফ || সাহিত্যগ্রাফি - বিশেষ সংখ্যা

Share This

কোন এক অজানা কারনে তেরো দিন জ্বরে ভুগে ইসু ওর সব স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিল। এমন কি ওর বাবা মা’কেও
চিনতে পারছিল না। মাঝে মাঝেই যখন ওর কথা ভেবে বিষন্ন বোধ করতে থাকি তখন মনে হয় স্মৃতিতো এমনই।
সবসময় হারিয়ে যাওয়ার সুপ্ত বাসনা থেকেই তা আমাদের ভেতর জমা হতে থাকে।
এপ্রিলের এক বিকেলে ইসু ফোন করে আমাকে বলেছিল ‘এই প্রথমবারের মতো ঘুমের ভেতর স্বপ্ন দেখলাম।
তোমার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।‘
আমার চোখে তখন রাজ্যের ঘুম। আমি কথা বাড়াতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু ধন্যবাদ বলে ফোন রেখে দিতেই ও
আবার ফোন করল।
‘কি স্বপ্ন দেখেছি জানতে চাইলে না?’
আপনি যত ব্যস্তই থাকুন না কেন বা আপনি আপনি যত ঘুমের ঘোরেই থাকুন না কেন একজন রুপবতী মেয়ে
বিশেষত যার সঙ্গে আপনি আগের রাতে একই বিছানায় ঘুমিয়েছেন আপনি তার তুচ্ছ স্বপ্নকেও অগ্রাহ্য
করতে পারেন না। তাই কিছুক্ষন চোখ কচলে বললাম ‘বল কি স্বপ্ন দেখেছো?’
‘দেখলাম একটা গ্রাম যার মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে একটা নদী। সময়টা সকাল ভোর হবে হয়তো। আমি নদীর
পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি। নদীতে স্রোত নেই। তাই হয়তো এটাকে নদী না বলে জলাভূমি বলাই ভাল। কিন্তু দেখতে
নদীরই মতো। হয়তো সর্পিলাকার কোন জলাভূমি। আমি তার তীরে দাঁড়িয়ে আছি। নদীতে ভেসে উঠেছে হাজার
হাজার মৃত কাক। আমি হাঁটু পানিতে নেমে একটা কাকের পাখা ধরে হাতে নিতেই দেখি ওটার গলায় একটা ট্যাগ
লাগানো “পারকিন্সন রোগে মৃত কাক”। তারপর আরও কয়েকটা কাক তুলে দেখি প্রত্যেকটা কাকের গলাতেই
সেই অদ্ভুত ট্যাগ ঝোলানো। ভাবতে পারো একটা জলাভূমিতে হাজার হাজার মৃত কাক তাও আবার গলায় এমন
আজব ধরনের ট্যাগ ঝোলানো। কেমন ভয় হতে থাকে আমার। ভয় আর বিষ্ময়ের এক মিশ্র অনুভূতিতে আমার
ঘুম ভেঙে যায়।‘
‘আমি জীবনে বহু স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্ন সবসময়ই কিছুটা ছাড়া ছাড়া ধরনের হয়। এতোটা স্পষ্ট স্বপ্ন কেউ
দেখে নাকি যেখানে এমন পারকিন্সনের মতো অপ্রচলিত শব্দ স্পষ্ট করে চোখে পড়ে? তুমি ছাড়া অন্য কেউ
এমন স্বপ্নের কথা বললে আমি ফাজলামি বলে উড়িয়ে দিতাম।
‘দেখ কোন ধরনের ফাজলামি আমি করছি না। এটা আমার জীবনে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখা প্রথম স্বপ্ন। তাই
ব্যাপারটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ন।‘
আমি চুপ করে থাকি। সত্যি বলতে কি এমন একটা স্বপ্নের ব্যাপারে কি বা বলার থাকতে পারে? আমি এমনকি
স্কুল জীবনে শখের বশেও স্বপ্নের ব্যাখ্যা লেখা কোন বইও পড়িনি যেগুলো আমার স্কুল বন্ধুদের কাছে খুব
জনপ্রিয় ছিল তখন। অথবা স্বপ্নের ফ্রয়েডীয় কোন মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণেও আগ্রহ বোধ করিনি।
কিন্তু যেটা গুরুত্বপুর্ন সেটা হচ্ছে ইসু ওর জীবনের প্রথম স্বপ্ন দেখেছে। ওর বয়স এখন ঊনিশ শেষ হয়ে বিশে
পড়েছে। এমন একটি মেয়ে এর আগে কখনো স্বপ্ন দেখেনি ব্যাপারটা একরকমের অবিশ্বাস্য। কিন্তু এটা ও
আমাকে পরিচয়ের শুরুর দিকেই বলেছিল। ও মিথ্যা বলার মানুষ না। তাছাড়া ওর বড় বোনের বিয়েতে গিয়ে ওর
কয়েকটা কাজিনের কাছেও ব্যাপারটা শুনেছি। ছোট বেলায় যখন সবাই সবার দেখা স্বপ্নের কথা (যদিও এইসবের
মধ্যে অনেক বানানো গল্পও থাকতো যেমনটা সব বাচ্চাদের স্বপ্নের ভেতরেই থাকে) বলতো ইসু অবাক হয়ে
তাকিয়ে থাকতো। ঘুমের মধ্যে আবার কেউ কিছু দেখে কি করে! রাতে একবার ঘুমোলে সকালে ভোর দেখতে পেতো
ও। এর মাঝে আর কিছুই না। ব্যাপারটা নিয়ে ওর কাজিনদের মধ্যে কৌতূহল আর কানাকানি এমন পর্যায়ে
পৌছেছিল যে ওর বয়স যখন নয় বছর তখন ওর মা ওকে এক সাইক্রিয়াটিস্টের কাছেও নিয়ে গিয়েছিলেন। যদিও
সাইক্রিয়টিস্ট বলেছিলেন ব্যাপারটা তেমন কিছুই না। ওর ঘুম খুব গভীর। তাই ও স্বপ্ন দেখে না। আর এই

সমস্যাটা ওর একার না । এমনটা অনেকেরই হয়। তবুও ব্যাপারটা নিয়ে একটা সময় ওর ভেতর একই সঙ্গে
অস্থিরতা আর অস্বস্তি কাজ করতো। বিশেষত যখন ওর বন্ধু বা কাজিনরা তাদের দেখা বিভিন্ন অদ্ভুত
স্বপ্নের কথা বলতো। ওর কাছে মনে হতো ঘুমের ভেতর সবার একটা অন্য রকম পৃথিবী আছে যা থেকে ও
বঞ্চিত। তারপর একসময় ও এই ব্যাপারটার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল।
স্বপ্ন ব্যাপারটাকে আমরা কেউই বোধহয় তেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখি না। তাই প্রথম প্রেম বা স্কুলের প্রথম
দিনের মতো প্রথম দেখা স্বপ্নের কোন স্মৃতি আমাদের থাকে না। ইসুর কথাটা শোনার পর আমি মনে করার
চেষ্টা করেছিলাম আমার দেখা প্রথম স্বপ্নের কথা মনে করতে। প্রথম দেখা স্বপ্ন বলতে আমি যা মনে করতে
পারি তা বড় খালার বাসায় রাতে দেখা অদ্ভুত আধা মানুষ আর আধা বিড়াল সদৃশ এক বিড়াল মানব যা আমি
দেখেছিলাম সম্ভবত যখন ক্লাস টুতে পড়ি। খুব সম্ভবত এটা আমার স্মৃতিতে থাকা সবচেয়ে পুরনো স্বপ্ন যা
আমি মনে করতে পারি। কিন্তু প্রথম স্বপ্ন না নিশ্চিত ভাবেই কারন এই স্বপ্ন দেখার পর আমি ‘কি দেখলাম!
কি দেখলাম!’ ধরনের কোন ভয়ে আক্রান্ত হইনি। শুধু একটা অদ্ভুত স্বপ্ন হিসেবে থেকে গিয়েছিল আমার
স্মৃতির ভেতর এবং আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমি স্বপ্ন দেখেছি। প্রথম স্বপ্ন আসলেই তেমন গুরুত্বপূর্ন
কিছু না। কিন্তু জীবনে আপনার এমন কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হবে যাদের কারনে আপনার অনেক তুচ্ছ বিষয়
নিয়েও ভাবতে হবে এই যেমন প্রথম দেখা স্বপ্ন অথবা আজকে জামাটা ঠিক মতো ইস্ত্রি করা হয়েছিলতো?
ইসুর জন্যই শেষ পর্যন্ত বিছানা ছাড়তে হলো। যেতে হবে ধানমন্ডি। লেকের পাড়ের সস্তার মুরগির চাপ খেতে।
আর একটা সুন্দর বিকেল ইসুর সঙ্গে যা হয়তো আমাকে আরেকটা দিন বেঁচে থাকার অনুপ্রেরনা যোগাবে।
ইসুর নাম আসলে ইসরাত। এতো বড় নাম ধরে ডাকাটা ঠিক সুখকর নয়। তাই নিশু নামের আমার এক বন্ধু ওর
নামটাকে ছোট করে ইসু ডাকতো। সেই থেকে আমরা সবাই ওকে এই নামেই ডাকি। ওর সাথে পরিচয় হয়েছিল
ভার্সিটির ড্রামা ক্লাবে। আমার দুই বছরের জুনিয়র। ভার্সিটির থার্ড ইয়ারে তখন আমি। একটা নাটক
বানাচ্ছিলাম কবি চন্দ্রাবতীকে নিয়ে। সেটাই ছিল আমার পরিচালনায় প্রথম মঞ্চ নাটক। অনেক দিন ধরেই
ভাবছিলাম চন্দ্রাবতীর চরিত্রে কাকে দিয়ে অভিনয় করানো যায়। সেই সময় ক্লাবে নতুনদের নিয়ে নবীনবরনের
ছোট একটা আয়োজন ছিল। ওখানে ইসুকে দেখেই মনে হলো আমি আমার নাটকের জন্য নায়িকা পেয়ে গেছি।
নাটকের সুত্রেই ওর কাছাকাছি আসা। যদিও সম্পর্কটা ছিল ভার্সিটির সিনিয়র জুনিয়রদের স্বাভাবিক
সম্পর্কের মতোই। এর বেশি কিছু না। তাছাড়া সেই সময় আমার গার্লফ্রেন্ড ছিল। তাই অন্য কারো দিকে
মনযোগ দেয়ার প্রয়োজন বোধ করিনি। এমন না যে আমি প্রেমের ব্যাপারে ‘এক নারী আর এক ঈশ্বর’ ধরনের
কোন শাশ্বত ভাবনায় বিশ্বাসী ছিলাম। শুধু অপ্রয়োজনীয় কিছুর পেছনে সময় নষ্ট করার মতো যথেষ্ট সময়
আমার হাতে ছিল না। তাছাড়া আমার সেই সময়ের প্রেমিকা প্রেম সম্পর্কে আমার জীবনে এমন তিক্ত
অভিজ্ঞতা এনেছিল যে প্রেমিকা হিসেবে কোন নারী সঙ্গের কথা ভাবলেই আমার এক ধরনের বিতৃষ্ণা বোধ
হতো। প্রেমের অভিজ্ঞতায় এতোটাই বিতৃষ্ণ ছিলাম যে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু নিশান আর আমি গে
হওয়ার কথা বলতাম প্রায়ই। কিন্তু সমস্যা ছিল জৈবিক ভাবে আমরা দুইজনের কেউই পুরুষের প্রতি আকর্ষন
বোধ করতাম না। তাই সেই ব্যাপারে আর তেমন কিছু আগায়নি।
সেই নাটক বানানোর দুই মাস পরের কথা। তারিখটা ছিল গত বছরের নভেম্বরের সাত তারিখ। দিনটা বিশেষ কিছু
অবশ্যই ছিল। সেদিন ছিল আমার আর আরিবার সম্পর্কের তিন বছর শেষ হয়ে চতুর্থ বছরে পা ফেলার দিন।
যদিও তার ঠিক এক সপ্তাহ আগে আরিবা নিজ থেকেই আমার সঙ্গে ব্রেক আপ করেছিল। যদিও আমাদের
সম্পর্কের তিক্ততা আমাকে বিতৃষ্ণ করে তুলেছিল তবুও ব্রেক আপ করার কথা ভাবিনি কখনো বা তেমন কিছুর
প্রয়োজন আছে বলেও মনে হয়নি।
আমার আর আরিবার সব কিছু কেন এতোটা তিক্ত হয়ে উঠেছিল? কারন আরিবা আসলে ‘তোমার চেয়ে ভাল কিছু
পাওয়ার আমি যোগ্য’ নামক এক চিকিৎসা অযোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিল। সম্পর্কের ভেতরে থাকা দুই

জনের এক জনকে যদি একবার এই রোগে ধরে তাহলে সে সম্পর্ক আসলে খুব বেশি দিন আর টেকে না। আরিবা
আর আমার ব্রেক আপ তাই হওয়ারই ছিল। যদিও এতো সব কিছুর পরও ছয় তারিখে আমি একটা শাড়ি নিয়ে ওর
বাসার নিচে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমাদের অ্যানিভার্সারির উপহার হিসেবেই নিয়েছিলাম। শাড়ি পড়ার মতো একটি
বিরক্তিকর ব্যাপারে ওর আগ্রহ দেখে আমার ভাল লাগতো। তাই কোন উপলক্ষ্য এলেই আমি ওকে শাড়ি
উপহার দিতাম। তিন ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকার পরও যখন ও ওর বাসা থেকে এলো না উলটো ফোনটাই বন্ধ করে
ফেললো আমি বাসায় ফিরে এসে সিদ্ধান্ত নিলাম ‘অনেক হয়েছে। আর না।‘ আগের দুই দিন ক্লাবের কাজ আর
সিস্টেম এনালাইসিসের একটা প্রজেক্টের কাজে ব্যাস্ত থাকায় ঠিকমতো ঘুমোতে পারিনি। তার উপর আরিবা
অথবা নিজের উপরই বিরক্ত হয়ে এক ক্যান ব্ল্যাক ডেভিল গলায় ঢেলে দিলাম ঘুম। পর দিন সকালে রিতু আপু
ফোন দিয়ে ভার্সিটি যেতে বললেও শরীর খারাপের কথা বলে গেলাম না। তাছাড়া সেদিন আমার কোন ক্লাস ছিল
না। তাই শুধু ক্লাবে বসে আড্ডা দিতে ভার্সিটি যেতে ইচ্ছে করছিল না। ঘুম থেকে উঠলাম সাত তারিখ বিকাল
সাড়ে পাঁচটায়। উঠে দুপুরের জন্য রান্না হওয়া বুয়ার হাতের ঠান্ডা হওয়া বিস্বাদ মুরগির মাংস দিয়ে ভাত
খেলাম। এরপর রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে এক কাপ কফি খেতে খেতে ভাবছিলাম কি করা যায়। সাগর ভাইকে ফোন
দিলাম। ওনার কাছে কেরুর দুই চারটা রামের বোতল সবসময়ই থাকে। পকেটে পয়সা নেই। কিন্তু এই মুহুর্তে
স্নায়ুকে ঠান্ডা রাখতে ড্রিংক করাটা জরুরী। ফ্রিতে ড্রিংক করার জন্য সাগর ভাইয়ের কাছে যাওয়া ছাড়া আর
কোন উপায় নেই। সারাটা সন্ধ্যা সাগর ভাইয়ের সাথে ড্রিংক করে বাসায় ফিরলাম রাত এগারোটায়। এসেই পড়ার
টেবিলের ড্রয়ার থেকে আরিবার লেখা সব চিঠিগুলো বের করলাম। সম্পর্কের তিন বছরে ও আমাকে
তিয়াত্তরটা চিঠি লিখেছিল যার শেষটা লিখেছিল প্রায় চার মাস আগে। ফোন আর ইন্টারনেটের যুগে প্রেমিকার
কাছ থেকে এতোগুলো চিঠি পাওয়া সত্যি বলতে ভাগ্যের ব্যাপার। সেই অর্থে আমি অবশ্যই ভাগ্যবান ছিলাম।
আরিবার উপর যত রাগ তার ঝাল এই চিঠির উপর তোলা যেতে পারে। কি করা যায় এগুলোকে? সবচেয়ে সহজ
সমাধান লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া। কিন্তু এমনটা করা যাবে না। এতোগুলো কাগজ একসঙ্গে পোড়ালে
ধোঁয়া আর পোড়া কাগজের গন্ধে পাশের রুম থেকে কেউ এসে বিরক্ত করতে পারে। আমি খুব প্রয়োজন না হলে
আমার মেসের কারো সঙ্গে কথা বলি না। রাত জেগে বাকি তিন রুমের সবাই আড্ডা দেয়, কার্ড খেলে। কিন্তু
আমি ওদের সঙ্গে কখনোই নিজেকে মেলাতে পারি না। আমার স্বভাবের কারনে ওরাও আমাকে এড়িয়ে চলে।
আরেকটা কাজ করা যেতে পারে চিঠিগুলোকে দলা করে কমোডে ফ্ল্যাশ করা যেতে পারে। কিন্তু তাহলে ঠিক মতো
আরিবার উপর রাগ ঝাড়া হয় না। শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম কাঁচি দিয়ে সবগুলো চিঠিকে কুঁচি কুঁচি করবো।
তখন রাত কত হবে? দুই’টা হয়তো। আমি আরিবার চিঠির অর্ধেকের বেশি কুঁচি কুঁচি করেছি ততক্ষনে। হঠাত
ফোন বেজে ওঠে। ফোন হাতে নিয়ে দেখি ইসুর ফোন। কিছুটা অবাক হয়েই ফোন ধরেছিলাম।
‘কি ব্যাপার? এতো রাতে ফোন করলে কেন? খারাপ কোন খবর নয়তো?’
‘না। তেমন কিছু না। ঘুম আসছিলো না’তো তাই আপনাকে বিরক্ত করতে ফোন করলাম।‘
সঠিক সময় বলে কি আসলেই কিছু আছে? আমি জানি না। তবে সৃষ্টিকর্তার পর সবচেয়ে শক্তিশালী বোধ হয়
সময়। আপনার সবকিছুই আসলে সময়ের উপর নির্ভর করে। এই যেমন একদিন আগেও যদি ইসু আমার সঙ্গে
রাত দুপুরে ফোনে কথা বলতে চাইতো আমি হয়তো বিরক্ত হতাম। হয়তো কথাই বলতাম না। কিন্তু সে’দিনের সেই
ফোন কলের পর সত্যিই আমার আর ইসুর সম্পর্ক চিরদিনের মতো বদলে গিয়েছিল।
আমরা কি প্রেম করছিলাম? অন্তত কাগজে কলমে ব্যাপারটাকে তেমন কিছু বলা যায় না। কিন্তু ভার্সিটি আর
ক্লাবের বাইরে যে সময়টুকু ছিল আমরা একসঙ্গে কাটাচ্ছিলাম। বিকাল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত আমরা
একসঙ্গেই থাকতাম। হয়তো লেকের পাড়ে সাম্পান রেস্তোরা না হয় বেঙ্গল বইয়ে বসে কাটিয়ে দিতাম ঘন্টার
পর ঘন্টা। যেহেতু আমরা দুই জন মেসে থাকতাম কারন আমাদের দুই জনের ফ্যামিলি ঢাকার বাইরে থাকতো

(আমার বাবা মা চাঁদপুরে আর ইসুর দিনাজপুরে) তাই আমাদের ক্লাস শেষেই বাসায় ফেরার কোন তাড়া ছিল না।
পরীক্ষার সময় কয়েকদিন বাদ দিলে বাকি সময়টা আমরা আমাদের মতো সারাটা সন্ধ্যা এক সঙ্গে কাটিয়ে
দিতাম। ক্লাবের ভেতর আমি, নিশু, নিশান, রিতু আপু আর সাগর ভাই ছিলাম পরিবারের মতো। কারন আমরা এই
পাঁচজনই ফ্যামিলি ছাড়া ঢাকায় থাকতাম। তাই হয়তো আমরাই ছিলাম আমাদের পরিবার। ভার্সিটির সবাই
আমাদের ডাকতো পঞ্চপান্ডব নামে। আমাদের সেই পরিবারে নতুন সদস্য ছিল ইসু। আমরা যদিও প্রেম করছি
এমন কিছু বলিনি তবুও বাকি সবাই আমাদের একাই থাকতে দিচ্ছিলো।
প্রেমে পড়ার জন্য সারাক্ষন ‘ভালবাসি’ ‘ভালবাসি’ বলাটা তেমন জরুরী না। আমি আর ইসু প্রেম করছিলাম
প্রেমের কোন আনুষ্ঠানিক পর্ব ছাড়াই। ঘন্টার পর ঘন্টা শুধু গল্প করে কাটিয়ে দেয়া যদি প্রেম হয় তাহলে
আমদের চেয়ে বেশি প্রেম আমার আশেপাশের কাউকে আমি করতে দেখিনি। আমরা কতটা কাছাকাছি এসেছিলাম?
সত্যি বলতে কি আরিবার সঙ্গে আমার প্রেমের কিছুদিন পরই আমরা এক সঙ্গে শুয়েছিলাম। এরপর থেকে
ভালবাসায় শরীর ছিল আমার কাছে একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু ইসুর সঙ্গে প্রথম ছয় মাস তেমন কিছুই
হয়নি এমনকি একটা চুমু পর্যন্ত খাইনি কেউ কাউকে। আমাদের খুব কাছাকাছি আসা বলতে ভার্সিটির সামনের
রাস্তায় ফুট ওভার ব্রিজের উপর কিছু সময় একজন আরেক জনকে জড়িয়ে ধরে থাকা। নিচে জেব্রা ক্রসিং
থাকায় খুব বেশি মানুষ এই ওভার ব্রিজ ব্যাবহার করতো না। ওভার ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে রাস্তায় গাড়ির আসা
যাওয়া দেখতে ইসু পছন্দ করতো। আমরা তাই সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতাম। ইসু গাড়ির আসা যাওয়া দেখতো আর
আমি দাঁড়িয়ে সিগারেট টানতাম। এরকমই একদিন ও আমাকে বলেছিল ‘তোমাকে খুব জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে।
একটু ধরি?”
সেদিন থেকে আমরা প্রায়ই ওভারব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে থাকতাম। আমাদের
অন্তরঙ্গতা এইটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল ঠিক পরের বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝি এক সোমবার রাত পর্যন্ত।
সেই দিনটার কথা আমি খুব ভাল ভাবেই মনে করতে পারি। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় নাট্য উৎসবের জন্য আমরা
গিয়েছিলাম আমাদের স্থায়ী ক্যাম্পাসে। যদিও আমরা এটাকে স্থায়ী ক্যাম্পাসের বদলে বলতাম ‘সামার হলিডে
ক্যাম্পাস’। ঢাকার সব প্রাইভেট ইউনিভার্সিটগুলোর সাভার, পুর্বাচল না হয় গাজীপুরে একটা স্থায়ী ক্যাম্পাস
আছে। ওইসব ক্যাম্পাসে ক্লাস হয় না খুব একটা। শুধু ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে ব্যাবহার
হয়। নাট্য উৎসবের পর ধানমন্ডি ক্যাম্পাসে আসতে রাত নয়টার মতো বাজে। সবাই যে যার মতো বাসায় চলে
যায়। ইসু, নিশু আর রিতু একই বাসায় থাকতো। ইসু আমার সাথে ঘন্টা খানেক পরে আসবে বলে রিতু আপু আর
নিশুকে বিদায় দেয়। আমরা রিকশা নিয়ে মোহাম্মদপুর বিহারী ক্যাম্পে বোবার বিরিয়ানি খেতে যাই। খাওয়া শেষ
করে রিকশায় উঠি ওকে বাসায় পৌঁছে দিবো বলে। রিকশায় উঠে ইসু আমাকে বললো ‘আজ রাতটা তোমার সঙ্গে
থাকতে ইচ্ছে করছে। কি করা যায় বলতো?’
শেষ পর্যন্ত লালমাটিয়ায় একটা আবাসিক হোটেলে থাকি সেই রাতে। সেই রাতেই প্রথম বারের মতো আমরা
মিলিত হই। মিলনের এই অভিজ্ঞতা আমাদের কারো জীবনেই এই প্রথম নয়। তবুও এক অবিশ্বাস্য ভাল লাগায়
সারা রাত এক ফোটাও ঘুমাইনি দু’জনের কেউই।
সকালে যে যার মতো করে বাসায় চলে যাই। ঠিক জানি না রিতু আপু বা নিশু আমাদের বিষয়ে কি মনে করেছিল বা
ওরা অন্য কাউকে এই ব্যাপারে কিছু বলেছিল কিনা। আমরা এতোটাই ভালো লাগায় ডুবেছিলাম যে সেইসব নিয়ে
ভাবিইনি। সেদিন বিকেলেই ইসু ফোন করে বলেছিল ও প্রথম বারের মতো স্বপ্ন দেখেছে। আমার ধারনা ছিল
আমাকে দিয়ে কিছুই হবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি আসলে কিছু না হোক কাউকে স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিলাম।
সে’দিনের সেই মিলন অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে সুখকর ছিল এবং আমরা অবশ্যই তৃপ্ত ছিলাম। কিন্তু কোন এক
অজানা কারনে এরপর কোন দিন আমরা মিলিত হইনি। আমি ওকে কাছে পেতে পাগলের মতো ছিলাম। কিন্তু ও

সবসময়ি বলতো ‘আরেকবার মিলিত হলে আমি আমার স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা আবার হারিয়ে ফেলবো। আমরা তো
এমনিতেই ভালো আছি তাই না?’
‘তোমার এমনটা কেন মনে হচ্ছে?’
‘জানি না। কিন্তু আমার মন সবসময়ই সত্যিটা বলে।‘
স্বপ্নের দায় এতো বড় দায় কে জানতো! প্রথম কিছু দিন ব্যাপারটা অসহ্য লাগতো। কিন্তু সত্যি বলতে কি ওর
সঙ্গ আমার এতোটাই ভালো লাগতো যে এই পুরো ব্যাপারটার সঙ্গে আমি মানিয়ে নিয়েছিলাম। সেই আগের
মতোই সন্ধ্যেগুলো সাম্পান রেস্তোরা আর বেঙ্গল বইতে কাটাতে থাকি। মাঝেমাঝে নিশু, রিতু আপু, সাগর ভাই,
নিশান আমাদের সাথে যোগ দেয়। একসাথে আড্ডা দেই, গান গাই, নাটক বানাই। সময়গুলো সুন্দর কাটছিল। মাস
ছয়েক পর অক্টোবরের এক বিকেলে ইসু জ্বরে পড়ে। আকাশ পাতাল জ্বর। প্যারাসিটেমল বা পানিতে কিছুই হয়
না। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নিয়ে যায় ওকে। ওর বাবা মা চলে আসে দিনাজপুর থেকে। জ্বরে ভোগার দশম দিনে
ও জ্ঞান হারায়। তিনদিন পর যখন জ্ঞান ফিরে তখন ওর জ্বর নেই। সাথে স্মৃতিও নেই। এক সাইক্রিয়াটিস্টের
কাছে ওর চিকিৎসা শুরু হয়। প্রতিদিন থেরাপি দেয়া শুরু হয় ওকে। ওর বাবা মা পাকাপাকি ভাবেই ঢাকায় চলে
আসে। এমন না যে ও পাগলামি করছিল বা কাউকে বিরক্ত করছিল। স্রেফ কিছু মনে করতে পারছিল না। ঘুরেফিরে
আমাদের পঞ্চপান্ডবের সবাই প্রতিদিনই ওকে দেখতে যাই। ও যে শূন্যতা আমাদের ভেতর তৈরি করেছিল ও
ছাড়া সেটা আর কেউই পূর্ন করতে পারতো না।
‘তুমি কি আমার কথা কিছু মনে করতে পারো?’
‘সত্যি বলছি কিছুই মনে করতে পারি না। তবে তোমার কথা শুনলে মনে হয় আমি যখন স্বাভাবিক ছিলাম তখন
তুমি আমার প্রেমিক ছিলে।‘ এক বিকেলে যখন ওর বাসায় বসে কথা বলছিলাম তখন ও আরও বলছিল ‘আমি শুধু
মানুষগুলোকে মনে করতে পারি না। কিন্তু অনুভূতিগুলো মনে করতে পারি।মানে বাবা মা বলতে কি বুঝায়, প্রেমিক
বা বন্ধু ব্যাপারগুলো কি সেটা বুঝি। ওই যে তুমি ছাড়াও যে চারজন আসে ওদের কথা শুনে বুঝতে পারি ওরা
আমার খুব ভালো বন্ধু ছিল। কিন্তু ওদের নিয়ে কোন স্মৃতি আমি মনে করতে পারি না। ঠিক মনে করতে পারি না
কখন কোথায় ওদের সঙ্গে পরিচয় বা কোথায় ওদের সঙ্গে ঘুরেছিলাম বা কি গল্প করেছিলাম কিছুই মনে করতে
পারি না।‘
সেই সময়গুলো আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। অনেকটাই উদভ্রান্তের মতো হয়ে গিয়েছিলাম আমি। মাঝেমাঝেই
জানতে ইচ্ছে করতো কেমন ছিলাম আমি ওর সেই হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিতে? একটা আদুরে বিড়াল? একজন
যত্নশীল বন্ধু? একজন ব্যক্তিত্ববান পুরুষ? একজন দায়িত্ববান প্রেমিক?
সেইসব কিছুই আর জানার উপায় নেই। কারন স্মৃতি এমনই। হারিয়ে যাওয়ার এক সুপ্ত বাসনা নিয়েই স্মৃতি একটু
একটু করে আমাদের ভেতর জমা হতে থাকে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here

Pages