জগন্নাথদেবের মন্দিরের শেষ দেবদাসী কে আর দেখা যাবে না - Songoti

জগন্নাথদেবের মন্দিরের শেষ দেবদাসী কে আর দেখা যাবে না

Share This

সুজিৎ চট্টোপাধ্যায়:পুরীর রথযাত্রার ইতিহাসে ঘটতে চলেছে এক অঘটন।৫ জুন স্নান যাত্রা।১০৮ ঘড়া জলে স্নান করবেন জগন্নাথ।প্রতি বছর এই স্নান দেখতে ভিড় করেন ভক্তরা।এবার ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন।সরাসরি স্নান দেখার সুযোগ নেই।সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতেই এই নির্দেশ।একই নিয় ম জারি হবে ২৩জুন রথযাত্রায়।ঘরে বসে টি ভি তে লাইভ অনুষ্ঠান দেখতে হবে ভক্তদের।পুরীর রথযাত্রার হাজার নিয়ম। এই উৎসব শোনা যায় সত্যযুগ থেকে হচ্ছে।  উৎসবের অন্যতম রীতি দেবদাসীদের নাচ। এক সময়ে রথযাত্রার দিন রথের আগে আগে ১২০ জন দেবদাসী নাচতে নাচতে মাসীর বাড়ি যেতেন। প্রভু জগন্নাথকে বিনোদন দেওয়াই ছিল কাজ। সেই রাম নেই , সেই অযোধ্যাও নেই। পুরীতে ২০১৫ সাল পর্যন্ত শিবরাত্রির সলতের মত একজন দেবদাসী ছিলেন। নাম ছিল তার শশিমণি। মাত্র সাত বছর বয়সে ওড়িশার পঞ্চোচৌড়া গ্রামের পরিজনকে ছেড়ে পুরীর মন্দিরে দেবদাসী হিসেবে নতুন জীবন শুরু করেন। এখন যদি প্রশ্ন করেন সে কি স্বেচ্ছায় এসেছিল?জবাব দিতে পারবো না।যুক্তিবোধ বলে, ওইটুকু বয়সে সে কি বুঝত? যাইহোক , সেই দেবদাসী শশিমণি ২০১৫ তে ২০মে ৯৪ বছর বয়সে মারা যায়। তিনি শেষবার প্রভুকে  নৃত্য পরিবেশন করে বিনোদন করেন ২০১১সালে। সেই বছর ষাঁড়ের গুঁতো খেয়ে কোমর ভেঙে বিছানায় আশ্রয় নিতে হয়। শেষ বয়সে আশ্রয় জোটে পালিত পুত্র সোমনাথ পণ্ডার কাছে। সোমনাথ ও তার স্ত্রী উন্নরানী ও নাতি রাজা তার দেখভাল করতেন। দুঃখ করে সোমনাথ বলেছিলেন, ওড়ি শা সরকার দেয় হাজার টাকা।পুরীর রাজা দেন পাঁচশ টাকা।এইটুকু পয়সায় একজন অসুস্থ  বৃদ্ধার কতটুকু প্রয়োজন মেটে? মা  চেয়েছিলেন নবকলেবরের আগে যেন তার মৃত্যু হয়। তাই হয়। ছ ফুট বাই পাঁচ ফুট ঘরে দিন কাটত তাঁর। অথচ যখন তাঁর যৌবন ছিল, কদর তখন দেখে কে?পায়ে  আলতা, নূপুর ,নাকে নোলক,  শাড়ি আর ফুলে চন্দনে চর্চিত হয়ে শশীমণি প্রস্তুত । রাতে প্রভুর ভোজনের পর গর্ভগৃহের দরজা যখন বন্ধ হবে, প্রভু বিশ্রাম নেবেন। তারপর দেবদাসী শশিমণির নাচ দেখে শয়নে যাবেন। প্রভুর রাতের খাওয়ার নাম বড় শৃঙ্গার ভোগ।নানা মিষ্টি, পিঠে, ঘি, পায়েস, ডাব,সুগন্ধি জল আর পান মুখে দিয়ে স্বামী দেবদাসীদের নাচ দেখে ঘুমোবেন। দেবদাসীদের প্রভু আর স্বামী স্বয়ং জগন্নাথ। ছোট থেকেই এটাই জেনে এসেছে শশিমণির  মত দেবদাসীরা।


দেবদাসী অর্থ দেবতার দাসী।হরিবংশ পুরাণে দেবদাসীদের উল্লেখ আছে। দেবমন্দিরে বিশেষ করে নারায়ণ মন্দিরে একাধিক দেবদাসীদের রাখা হতো। অসহায় দরিদ্র ধর্মভীরু পরিবারের কন্যাকে দেবতার কাছে উৎসর্গ করা হতো।দেবদাসীদের কাজ, নৃত্যগীত দিয়ে দেবতাকে খুশি করা।দেবদাসীদের মেয়ে দেবদাসী হতো। প্রশ্ন করবেন না ,দেবদাসীদের তো স্বামী জগন্নাথ। সুতরাং সন্তান হতো কি করে? উত্তর একটাই। দৈব কৃপা।বৃদ্ধ  বয়সে কখনও কখনও সন্তান দত্তক নিতেন তাঁরা।

এই দেবদাসী প্রথা কবে থেকে শুরু জানার সুযোগ নেই। তবে কথিত আছে, যে পুরুষ ভক্তরা মন্দিরে  মোটা টাকা দান দিতেন,তাদের মনোরঞ্জনের ভার পড়ত দেবদাসীদের। সন্ধ্যাকরের  'রাম চরিত' এ দেবদাসীদের দেববারবনিতা বলা হয়েছে।পবনদূত গ্রন্থে ' বলা হয়েছে।মন্দিরের দরজা বন্ধ হওয়ার পর কারা এই দেবদাসীদের রূপসুধা পান করতেন তা রহস্যময়। ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার বলেন, মধ্য যুগে এই প্রথার চল ছিল বেশি। বৌদ্ধ ধর্মের পতনের পর প্রথম বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনীরা আক্রান্ত হতেন হিন্দু ধর্মগুরুদের হাতে।শঙ্করাচার্যের আবির্ভাবে হিন্দু ধর্মে দীক্ষিতরা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আক্রমণ করতে শুরু করলে বৌদ্ধভিক্ষুরা পালিয়ে প্রাণ বাঁচান নেপালে,শ্রীলঙ্কায়। কেউ কেউ মারাও পড়তেন। সংঘে থেকে যেতে বাধ্য হতেন ভিক্ষুনীরা। তাঁরা হলেন নহ মাতা, নহ কন্যা,  নহ বধূ। তাই উৎসর্গীকৃত হতেন দেবতার প্রতিনিধি পুরোহিত আর সমাজপতিদের কাছে। এদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতেন হিন্দু রাজারা। ১০০৪সালের তথ্য বলছে, দক্ষিণ ভারতে তান্তরের  এক মন্দিরেই দেবদাসী ছিল ৪০০জন। চিনা পরিব্রাজক চাও জু কাও গুজরাট ভ্রমণের সময় অন্ধ্র, তামিলনাড়ু,কর্ণাটক ওড়ি শাতে দেখেছেন বিভিন্ন মন্দিরে কুড়ি হাজারের বেশি দেবদাসী। ৪০০বছর আগে ভারতে আসেন ফরাসি বণিক বাতিস্থ। তিনি লেখেন,হায়দ্রবাদের গোলকুন্ডাতে মন্দিরে ছিল ২০হাজার দেবদাসী। প্রতি শুক্রবার রাজ দরবারে হিন্দু মুসলিম  মহিলা বন্দীরা নাচত। রাজা ছাড়াও সেই দেবদাসীদের ভোগ করত পুরোহিতরা।


ফিরে যাই হাজার বছর আগে। দরিদ্র এক দম্পতি তাদের এক কিশোরী কন্যা পদ্মাবতীকে  নিয়ে এলেন পুরীতে। উদ্দেশ্য দেবদাসী বানানো। পদ্মাবতীর মা বাবা স্বপ্ন পেলেন জগন্নাথের। এই কন্যাকে নিয়ে যাও বাংলার অজয় নদের তীরে কেন্দুলিতে। সেখানে আমার ভক্ত জয়দেব আছে। তাঁর কাছে রেখে এসো। দম্পতি তাই করলেন। অবশ্য শুধু হিন্দু মন্দিরে নয়, বৌদ্ধ ও জৈন মন্দিরেও দেবদাসী ছিলেন। লিখেছেন সুরেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও রমলা দেবী  তাদের ভারতীয় সমাজে প্রান্ত বাসিনী গ্রন্থে।(পৃষ্ঠা ২৩৫/সংস্কৃত পুস্তক ভান্ডার)।শ্রী চৈতন্য চরিতামৃতে বর্ণিত আছে, সন্ন্যাসী রামানন্দ নির্বিকার চিত্তে এই দেবদাসীদের অঙ্গ সংস্কার করে সাজিয়ে দিতেন।পুরীতে চৈতন্যদেব কিছু দেবদাসীকে দীক্ষাও দিয়েছেন।
বিগত শতাব্দীতে পণ্ডিত মদন মোহন মালব্য ও গান্ধীজি দেবদাসী প্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। আজ দেবদাসী প্রথা নিষিদ্ধ হলেও আড়ালে আবডালে সেবিকা নামে দেবদাসী প্রথা চালু আছে।বিভিন্ন হিন্দু ধর্মীয়গুরুদের আশ্রমে খোঁজ মিলছে জোর করে আটক রাখা নারীদের করুণ জীবনের আলেখ্য।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here

Pages